দেশে এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গরু মোটাতাজাকরণ ও দুগ্ধ খামার গড়ে উঠেছে। ফলে উন্নত জাতের গরু পালন, বাচুর প্রজনন এবং গাভীর যত্নের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। বিশেষ করে গাভী পালনে পরিচর্যা এবং রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে ধারণা থাকা অপরিহার্য। বিদেশি বা উন্নত জাতের গাভী পালনে আগ্রহ বাড়ার সাথে সাথে কিন্তু রোগবালাইয়ের চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। ফলে গাভীর নানা রোগ ও এর প্রতিকার সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে কোনোভাবেই খামার লাভজনক করা সম্ভব হবে না।
নিচে গাভীর কিছু সাধারণ রোগ ও তার প্রতিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. ওলান পাকা রোগ (Mastitis)
কারণ: বিভিন্ন রোগজীবাণু বা রাসায়নিক দ্রব্যের সংক্রমণ।
লক্ষণ: ওলান লাল হয়ে গরম হওয়া, ব্যথা, দুধের সাথে ছানার মতো টুকরা বের হওয়া, দুধ কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া।
চিকিৎসা: পরিষ্কার স্থানে রাখা, জমে থাকা দুধ বের করে দেওয়া, অ্যান্টিবায়োটিক ও ম্যাসটাইটিস টিউব ব্যবহার করা।
২. পেট ফাঁপা (Bloat)
কারণ: গরহজম বা অন্যান্য রোগ।
চিকিৎসা: দানাদার খাদ্য বন্ধ করে শুকনো খড় খাওয়াতে দেওয়া, নিওমেট্রিল বা কারমিনেটিভ মিক্সচার ব্যবহার করা।
৩. ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা (Diarrhea)
কারণ: অস্ত্রের রোগ বা অন্যান্য সংক্রমণ।
লক্ষণ: দুর্বলতা, পাতলা পায়খানা।
চিকিৎসা: সকেটিল পাউডার বা স্টিনামিন ট্যাবলেট ব্যবহার করা।
৪. নিউমোনিয়া (Pneumonia)
কারণ: ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস বা ঠান্ডা লাগা।
লক্ষণ: ঘনঘন শ্বাস, শ্বাসকষ্ট, কাশি, জ্বর, নাক দিয়ে সর্দি পড়া।
চিকিৎসা: ভেলুস ২০%, অ্যান্টিবায়োটিক, ক্লোরেটেট্রাসন বা টেরামাইসিন ব্যবহার করা।
৫. কৃমি (Worms)
কারণ: বিভিন্ন প্রকার কৃমির সংক্রমণ।
লক্ষণ: দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, ওজন কমে যাওয়া, পাতলা পায়খানা, দুধ কমে যাওয়া।
চিকিৎসা: গোবর পরীক্ষা করে কৃমিনাশক ওষুধ ব্যবহার করা।
৬. মিল্ক ফিভার (Milk Fever)
কারণ: ক্যালসিয়ামের অভাব।
লক্ষণ: ক্ষুধামন্দা, দুর্বলতা, মাংসপেশী কাঁপা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
চিকিৎসা: ক্যালসিয়াম ইনজেকশন দেওয়া।
৭. কিটোসিস (Ketosis)
কারণ: শর্করা জাতীয় খাদ্যের বিপাকক্রিয়ার সমস্যা।
লক্ষণ: ক্ষুধামন্দা, দুধ কমে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, নিঃশ্বাসে এসিটোনের গন্ধ।
চিকিৎসা: অপটিকরটেনল-এস ইনজেকশন দেওয়া।
৮. ফুল আটকে যাওয়া (Retained Placenta)
কারণ: বাচ্চা প্রসবের পর ফুল বের না হওয়া।
চিকিৎসা: অক্সিটোসিন, ইউটোসিল পেশারিস বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা।
৯. জরায়ুর প্রদাহ (Metritis)
কারণ: জীবাণুর সংক্রমণ বা গর্ভফুলের টুকরা জমে থাকা।
লক্ষণ: জ্বর, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, ক্ষুধামন্দা, দুধ কমে যাওয়া।
চিকিৎসা: ইউটোলিস পেশারিস বা অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেওয়া।
১০. গর্ভপাত (Abortion)
কারণ: রোগজীবাণু, আঘাত বা বিষক্রিয়া।
চিকিৎসা: ইউটোসিল পেশারিস বা অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেওয়া।
১১. অনুর্বরতা ও সাময়িক বন্ধ্যাত্ব (Infertility)
কারণ: প্রজনন ইন্দ্রিয়ের সংক্রমণ, হরমোনের অভাব বা পুষ্টিহীনতা।
চিকিৎসা: হরমোন থেরাপি, ইউটোলিস পেশারিস বা স্টিমাভেট ট্যাবলেট ব্যবহার করা, ভিটামিন 'এ' যুক্ত খাবার দেওয়া।
১২. খুরো বা খুর পচা (Foot Rot)
কারণ: আঘাত বা সংক্রমণ।
লক্ষণ: ঘা, রক্ত জমা হওয়া, খুঁড়িয়ে হাঁটা, ক্ষুধামন্দা, জ্বর।
চিকিৎসা: ভেসাডিন, ভেসুলাং ২০% ইনজেকশন, অ্যান্টিবায়োটিক ও ডাস্টিং পাউডার ব্যবহার করা।
১৩. ককসিডিওসিস বা রক্ত আমাশয় (Coccidiosis)
কারণ: পরজীবী সংক্রমণ।
লক্ষণ: পাতলা পায়খানা, রক্তশূন্যতা, ওজন কমে যাওয়া, জ্বর, দুর্গন্ধযুক্ত পায়খানা।
চিকিৎসা: ভেলুস ২০% ইনজেকশন বা সকেটিল পাউডার ব্যবহার করা।
১৪. বেবিসিয়াসিস বা রক্ত প্রস্রাব (Babesiosis)
কারণ: আটালি দ্বারা সংক্রমিত রোগজীবাণু।
লক্ষণ: জ্বর, জাবর কাটা বন্ধ হওয়া, লাল প্রস্রাব।
চিকিৎসা: বেরিনিল ইনজেকশন, নেগুভন বা আসানটল স্প্রে ব্যবহার করা।
১৫. উকুন/আটালি (Lice/Ticks)
কারণ: বহিঃ পরজীবী সংক্রমণ।
চিকিৎসা: নিওসিডল, আসানটল বা নেগুভন স্প্রে ব্যবহার করা।
১৬. প্যারাটিউবারকিউলসিস প্রতিরোধ (Paratuberculosis Prevention)
কারণ: Mycobacterium paratuberculosis নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ।
প্রতিরোধ: স্টেইনলেস স্টিলের পাত্রে ক্লোরিন মিশ্রিত জল সরবরাহ করা।
গাভীর এই রোগগুলো প্রতিরোধে নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সুষম খাদ্য সরবরাহ ও সঠিক পরিচর্যা করা আবশ্যক। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আরও পড়ুন:
ডেইরি খামারির সর্বনাশ ডেকে আনে যে রোগ Read more...
সুস্থ ও উন্নত গাভী কীভাবে চিনবেন Read more...
গরুর কিছু সাধারণ রোগ ও সহজ সমাধান Read more...
0 Comments